মোঃ ফরহাদ রেজা,দেওয়ানগঞ্জ প্রতিনিধিঃ জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ি আকন্দ পাড়া পল্লী চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা বানিয়েছেন পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল তৈরীর মেশিন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর পলিথিন পুড়িয়ে তেল বের করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
সানন্দবাড়ী বাজার ও আশপাশের হাট বাজারগুলোতে যত্রতত্র থাকা পরিবেশ নষ্টকারী পলিথিন গুলো টোকাইদের মাধ্যমে বা হকারদের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। বিশাল এক ড্রামের ভিতর পলিথিন গুলো পুড়ে দিয়ে খিলগালা করে আগুনে তাপ দিতে থাকেন, আগুনের উচ্চতাপে বাষ্পীভুত হয় কাঙ্খিত তরল তেল। সেগুলো পরিশোধন করে পাওয়া যায় পেট্রোল ও কেরোসিন।
আশেপাশের অনেকেই জানান তারা এই তেল দিয়ে চলতি বোরো মৌসুমে সেচের কাজ সম্পন্ন করছেন, এতে করে অনেকটাই কমে এসেছে জ্বালানি খরচ।
পরিত্যক্ত পলিথিন বর্জ্য থেকে তৈরি করছেন ডিজেল ও পেট্রোল । শিগগিরই পোড়া পলিথিনের কালি থেকে ছাপাখানা, প্রিন্টার ও ফটোকপির কালি উৎপাদনও শুরু করবেন বলেও জানান উদ্যোক্তা গোলাম মোস্তফা।
দেশের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি পলিথিন থেকে রক্ষা পাওয়ার এই উদ্যোগে বেশ খুশি স্থানীয় লোকজনসহ অনেকেই। তাঁর এই উদ্যোগে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয় পরিদর্শনও করেছেন
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ও অর্থনীতি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডক্টর হুমায়ুন কবির,
ঢাকা মোহাম্মদপুর সরকারী কলেজ সহযোগী অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ জহুরুল ইসলাম,
ময়মনসিংহ মমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর মোঃ শফিকুল ইসলাম আকন্দ।
আমাদের দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে পলিথিন বর্জ্য। দৈনন্দিন জীবনে পলিব্যাগ ও পলিপ্যাকেট অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ হওয়ায় এইসব পরিত্যাগ করা যাচ্ছে না। আবার সহজে পচনশীল না হওয়ায় ব্যবহৃত পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক যত্রতত্র ফেলার ফলে আমাদের চারপাশের নদী-নালা, খাল-বিলসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ঊর্বরা শক্তি হ্রাসসহ নানাভাবে চারপাশের ভূমিকে দূষিত করছে। ফলে আমাদের চারপাশের সামাজিক পরিবেশ এই পলিথিন বর্জ্যের কারণে আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
হুমকি থেকে সামাজিক পরিবেশ রক্ষায় এবং পেট্রোল ও ডিজেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদ উৎপাদন এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ায় বেশ খুশি গোলাম মোস্তফা নিজেও। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন দেখতে প্রতিদিন তাই উৎসুক মানুষ ভিড় করছে তার কারখানায়।
উদ্যোক্তা জানান, ২০১৬ সন থেকে আমি এ উদ্যোগটি গ্রহণ করি।
বর্তমানে কারখানাটিতে প্রতিদিন ৬০ কেজি পরিত্যক্ত পলিথিন পুড়িয়ে ৩০-৩৫ লিটার পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন করছেন। ৩০লিটার জ্বালানী তেল উৎপাদনে ব্যয় হয় ৮ শ থেকে ১ হাজার টাকা।
২ লাখ টাকা ব্যয়ের এই কারখানায় আগামীতে কলম বা প্রিন্টের কালি উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করার চিন্তা ভাবনা আছে বলেও জানান এই উদ্যোক্তা । তাঁর এই কারখানায় কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ৩-৫ জন পুরুষ ও নারী শ্রমিকের।
পলিথিন বর্জ্যকে উচ্চমাত্রায় হিট দেওয়ার ফলে পলিথিনের হাইড্রোকার্বনের চেইন ভেঙে যায়। হাইড্রো কার্বনের চেইন ভেঙে যাওয়ার ফলে লিকুইড গ্যাস তৈরি হয়। সেই লিকুইড গ্যাস ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে বেশ কয়েকটি চেম্বার পার হয়ে কলিন কনডেনসারে প্রবেশ করে,
যা আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে পেট্রোল আলাদা হয়ে যায়। পেট্রোল ও ডিজেল আলাদা হয়ে ওয়াটার ফিল্টারের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে চেম্বারের নির্দিষ্ট জ্বালানি চেম্বারে গিয়ে জমা হয়।
পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় পাইরোলাইসিস প্রসেস। এই প্রক্রিয়ায় পলিথিন বা প্লাস্টিককে উচ্চ তাপমাত্রায় বিক্রিয়া ঘটিয়ে পলিথিনের অণুগুলো আলাদা করা হয়।
যার মাধ্যমে তরল গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই তরল গ্যাস আস্তে আস্তে তাপমাত্রা হ্রাস হওয়াতে ঘনীভূত হতে শুরু করে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর এই তরল গ্যাস পেট্রোল ও ডিজেলে পরিণত হয়ে আলাদা আলাদা পাত্রে জমা হতে থাকে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এর মান নির্ণয়ের ফলাফলে পলিথিন থেকে উৎপাদিত এই জ্বালানি তেলের মান হচ্ছে ৯৩.৫৬। যা নর্মাল জ্বালানি থেকে ১.৫৬ পার্সেন্ট জ্বালানি ক্ষমতা বেশি এবং পুরোপরি লো কার্বনের জ্বালানি। এতে করে নর্মাল জ্বালানির চেয়ে বেশি রান করে যানবাহন। আর এই জ্বালানি পরিবেশের জন্য পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত ।
ড. জহিরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশের জন্য যদি এটা উপকারী হয়, পরিবেশবান্ধব কিনা এটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা দরকার।
ড. হুমায়ুন কবির বলেন, পলিথিন বা প্লাস্টিক বর্জ্য হতে জ্বালানী পদার্থ যথা ডিজেল, পেট্রল বা অক্টেন উৎপাদনে গোলাম মোস্তফার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার।
এ ধরণের উৎপাদন বানিজ্যিকভাবে করা গেলে তা যেমন পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়ক হবে তেমনি জ্বালানীর চাহিদা পূরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তবে এটা পরিবেশবান্ধব কিনা সে বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, সারা বিশ্বের বৈজ্ঞানিকগণ পলিথিন বা প্লাস্টিক বর্জ্য হতে জ্বালানী উৎপাদন বিষয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তারা অনেকাংশে সফল হয়েছেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে পল্লী চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা যে উদ্যোগটি নিয়েছে নিঃসন্দেহে তিনি প্রশংসার দাবি রাখেন। তবে এটি পরিবেশের জন্য কতটুকু সহায়ক হবে এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন